ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টাকা নিয়ে দুশ্চিন্তা শেষ কাজের গতি বেড়েছে

Uncategorized

রাজধানীর যানজট নিরসনে অন্যতম মেগাপ্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে এসেছে নতুন গতি। দীর্ঘদিন অর্থসংকট ও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় কাজ থমকে গেলেও এখন প্রকল্পটি নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অর্থের জোগান নিয়ে এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত হওয়ায় চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের কাওলা থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। সড়কটির দৈর্ঘ্য ১৯.৭৩ কিলোমিটার। হাতিরঝিলসংলগ্ন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর এর সুফল পাচ্ছে রাজধানীবাসী।জানা গেছে, ২০০৯ সালে প্রকল্প নেওয়া হলেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে। আর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি। ২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর কাওলা থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার অংশ উদ্বোধন করা হয়। আর ২০২৪ সালের ২০ মার্চ বিএফডিসি গেটসংলগ্ন নামার র‌্যাম্প যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়।সরেজমিনে দেখা গেছে, এফডিসি গেট থেকে মগবাজার রেলগেট পর্যন্ত গার্ডার বসানোর কাজ প্রায় শেষ। মগবাজার ফ্লাইওভারের ওপর গার্ডার বসানো হয়ে গেছে এবং এখন কাজ মালিবাগের দিকে এগোচ্ছে। মালিবাগ থেকে খিলগাঁও পর্যন্ত রাস্তার মাঝখানে মিডিয়ানে চলছে পিলার পাইলিংয়ের কাজ, যেখানে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রকৌশলী ও নির্মাণ শ্রমিকরা।মগবাজার রেলগেটে কথা হয় নির্মাণ শ্রমিক আলী আকবরের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এক মাস ধরে আমি এক্সপ্রেসওয়ের কাজে যুক্ত হয়েছি।দিনরাত শিপটিং করে কাজ চলছে। চায়না ইঞ্জিনিয়াররা একটু গাফিলতি দেখালেও বকাঝকা করে। এই অংশে এখন আমরা গার্ডারের কাজ করছি।’ রেললাইনের ওপর এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজের গাড়ি দ্রুত যাওয়ার জন্য অন্যগাড়ি থামিয়ে দিচ্ছিলেন মাসুম বিল্লাহ নামের এক শ্রমিক। তিনি জানান, তিনজন শ্রমিক শুধু মগবাজার রেলগেটের অংশে নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত গাড়িগুলো দ্রুত মুভমেন্ট এবং নিরাপত্তার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করেন।আশপাশের এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হলে তাঁরা জানান, প্রকল্পটির কাঠামো নির্মাণে একসময় শত শত শ্রমিক কাজ করলেও মাঝখানে কোনো শ্রমিক ছিল না। এখন আবার দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে। কর্মব্যস্ততা দেখেই ভালো লাগছে। মগবাজারে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ‘স্টকইয়ার্ডে’ (নির্মাণকাজ পরিচালনার স্থান) মাস দেড়েক আগে কোনো শ্রমিক দেখা না গেলেও এখন সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ।মালিবাগ থেকে বাসাবো হয়ে কমলাপুরের দিকে যাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের কাজ করতে সড়কের মিডিয়ানের সব প্রতিবন্ধকতা কয়েক মাস আগে সরিয়ে নেওয়া হয়। এখন নতুন করে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে কাজ করছেন শ্রমিকরা। কমলাপুর রেলওয়ে ইয়ার্ড অংশে পাইলিংসহ বেশ কিছু অবকাঠামোগত কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। হাতিরঝিলের অভ্যন্তরে র‌্যাম্পের কলামও দৃশ্যমান।প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত আখতার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছি। প্রায় দুই হাজার শ্রমিক ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। মালিবাগ পর্যন্ত কাজ হয়ে গেছে, খিলগাঁও পর্যন্তও দ্রুত শেষ হবে। যাত্রাবাড়ী পেরিয়ে কুতুবখালী পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যেতে পারব ইনশাআল্লাহ।’তিনি আরো বলেন, ‘প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে কুতুবখালী পর্যন্ত অংশ চালু করার লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে। প্রকল্প এলাকায় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ফিরেছে আত্মবিশ্বাস, আর রাজধানীবাসী অপেক্ষা করছে যানজটমুক্ত এক নতুন দিনের।’

শেয়ার জটিলতা শেষে নতুন উদ্যম : শেয়ার নিয়ে বিদেশি ঠিকাদারদের বিরোধে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ প্রথম দফা বন্ধ হয়। ওই বছরের ৫ আগস্ট দেশের পটপরিবর্তনের পর ধীরগতিতে আবার কয়েক মাস কাজ চলে। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে আবারও প্রকল্পটির নির্মাণকাজ বন্ধ থাকে। পরে নতুন অর্থায়নে চলতি বছর জুন মাসের মাঝামাঝিতে আবারও কাজ শুরু হয়।তত্ত্বাবধায়ক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) বড় এই প্রকল্পে বাংলাদেশ ছাড়াও থাইল্যান্ডের একটি এবং চীনের দুটি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগসহ নির্মাণকাজের অংশীদার। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কম্পানি লিমিটেড, শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য এফডিইই কম্পানি লিমিটেড নামের কম্পানি গঠন করে ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট। কম্পানির অংশীদার তিন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যথাক্রমে ৫১, ৩৪ ও ১৫ শতাংশ ছিল।চুক্তি অনুযায়ী সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট কম্পানির শেয়ার পরিবর্তন করতে চাইলে আইনি জটিলতা তৈরি হয়। পরে ইতালিয়ান কম্পানিটি উচ্চ আদালত, সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারে নালিশ করেও কোনো রায় নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম না হলে আইনি বাধা না থাকায় শেয়ার পরিবর্তন করে দেয় সেতু কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড ২০ শতাংশ এবং চীনের শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ৮০ শতাংশ শেয়ারের মালিক। আর ইতালিয়ান-থাই কম্পানির একটি শেয়ার রয়েছে। যেটিও বাতিল হয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সমস্যার সমাধান হলেও আগের ব্যাংক অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় শ্যানডং অর্থের ব্যবস্থা করেছে। ফলে দ্রুতই নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।এই প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। চুক্তি অনুসারে, মূল কাঠামো নির্মাণ ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ জোগান দেওয়ার কথা ছিল বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের, আর বাকি ২৭ শতাংশ দেওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশ সরকারের, যা ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ডিং (ভিজিএফ) নামে পরিচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *