চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা বিভিন্ন খাতে রোগীদের দেওয়া প্রায় ৫৯ লাখ টাকা হাসপাতালের ক্যাশিয়ার আজিজুল হক সেলিম আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই বিপুল অঙ্কের টাকা তছরুপ করার অভিযোগ তদন্তে সরকারি এই হাসপাতাল থেকে দুটি এবং বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) কার্যালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। আলাদা তিন কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে ক্যাশিয়ারের টাকা তছরুপের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা ফেরত দিলেও সেলিমের কাছে এখনো হাসপাতালের ৫৭ লাখ ৬০ হাজার ১৫৫ টাকা পাওনা রয়েছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ক্যাশিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হলেও এখনো জবাব আসেনি বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। অন্যদিকে কর্মস্থলে বহাল তবিয়তে কাজ করছেন ক্যাশিয়ার আজিজুল হক সেলিম।
অভিযোগ উঠেছে, রোগীদের এসব টাকা আত্মসাতের মতো গুরুতর অপরাধ করার পরও ক্যাশিয়ার আজিজুল হক সেলিমের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পাশাপাশি ক্যাশিয়ার সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত কমিটির কাছে স্বীকারও করেছেন।এর পরও ব্যবস্থা নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয়।হাসপাতালের গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাশিয়ার আজিজুল হক সেলিম ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্যাথলজি, ইসিজি, আইসিইউ, টিকিট কাউন্টার, জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি, ফিজিওথেরাপি, পেয়িং (বেড/কেবিন), অ্যাম্বুল্যান্স ও ওয়ার্ড (১০) থেকে রোগীদের দেওয়া ৫৮ লাখ ৬৯ হাজার ৩৯০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেননি।
ওই দুটি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুল মান্নান গত ১২ মার্চ চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. অং সুই প্রু মারমা বরাবর একটি প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) তাঁর কার্যালয়ের উপপরিচালক ডা. কামরুল আজাদকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে।ওই কমিটির তদন্তকালীন সময়ের মধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যাংকে জমা দিয়েছেন ক্যাশিয়ার সেলিম। এই কমিটিও সেলিমের টাকা তছরুপের প্রমাণ পেয়েছে বলে তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা যায়। বিভাগীয় পরিচালকের গঠন করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ক্যাশিয়ার আজিজুল হক সেলিমের কাছে ওই তিন অর্থবছরে (সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত) চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ইউজার ফি বাবদ পাওয়া টাকার পরিমাণ ৫৭ লাখ ৬০ হাজার ১৫৫। এসব পাওনার মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ১০ হাজার ৭৭৫ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৭ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫৫ টাকা এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সাত লাখ ৭৩ হাজার ৪২৫ টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সরকারি কোষাগারে এসব টাকা জমা দেওয়া হয়নি।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সদ্য বদলি হওয়া তত্ত্বাবধায়ক (উপপরিচালক) ডা. মো. আব্দুল মান্নান গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যোগদানের পর গত জানুয়ারি মাসে ইউজার ফি মনিটরিং করার সময় দেখা গেছে, আদায়কৃত টাকা ঠিকমতো ব্যাংকে জমা দেওয়া হচ্ছে না। ক্যাশিয়ারকে টাকা জমা দিতে বললে তিনি গড়িমসি করছেন। এরপর আমি হাসপাতালের আরএমওকে (আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করি। ওই কমিটিকে চলতি অর্থবছরের (২০২৪-২৫) তদন্ত করতে নির্দেশ দিয়েছিলাম। কমিটি তদন্ত করে ক্যাশিয়ারের ৯ লাখ টাকা তছরুপের প্রমাণ পায়। এরপর জ্যেষ্ঠ এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে (বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক) প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি করি। কমিটির প্রতিবেদনে ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ক্যাশিয়ারের প্রায় ৫০ লাখ টাকা তছরুপের প্রমাণ মিলেছে।এক প্রশ্নের জবাবে ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সরকারি কোষাগারে ক্যাশিয়ার টাকা জমা না দেওয়ার ঘটনায় দুই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর আমি বিভাগীয় পরিচালক মহোদয়ের কাছে একটি প্রতিবেদন দিয়েছি। এতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের করণীয় জানতে চেয়েছিলাম।’এ বিষয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. অং সুই প্রু মারমা গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ক্যাশিয়ারের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে বিভাগীয় কার্যালয় থেকে একটি কমিটি করি। কমিটির প্রতিবেদনে সরকারি কোষাগারে টাকা জমা না দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে মাস খানেক আগে আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে চিঠি লিখেছি। সেখান থেকে নির্দেশ পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে থাকা কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আকরাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের তদন্তের পর বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয় থেকেও একটি তদন্ত কমিটি হয়। পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানা যাবে।’হাসপাতালের ইউজার ফি বাবদ আদায় করা প্রায় ৫৮ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ক্যাশিয়ার মো. আজিজুল হক সেলিম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু টাকা জমা দিয়েছি।’কত টাকা জমা দিয়েছেন—জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ক্যাশিয়ার পদে কর্মরত থাকলেও তিন-চার মাস ধরে টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে নেই।’