
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই ২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টভুক্ত স্টিলথ ফাইটারকে আঘাত করতে সক্ষম হলো। পেন্টাগন বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করলেও এর পেছনের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি সত্যিই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এফ-থার্টি ফাইভকে লক্ষ্যবস্তু করে থাকে, তবে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সমরাস্ত্রের যে অজেয় ইমেজ ছিল তা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধবিমানের যে কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, তা এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে।
ভূমিভিত্তিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাতেও ইরান বড় ধরনের সাফল্য দাবি করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাডের অন্তত চারটি রাডার এরই মধ্যে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন ঘাঁটিতে থাকা এসব রাডার ধ্বংস হওয়ায় ওই অঞ্চলের আকাশ সুরক্ষা এখন অনেকটাই নড়বড়ে। প্রতিটি রাডারের মূল্য ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার। বিশ্বের মাত্র ১০টি থাড সিস্টেমের মধ্যে ৪টিই এখন কার্যকারিতা হারিয়েছে, যা ওয়াশিংটনের জন্য এক বিশাল সামরিক বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর বাইরে কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে থাকা অত্যাধুনিক আর্লি ওয়ার্নিং রাডারটিও ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শত কোটি ডলার মূল্যের এই বিশাল রাডার সিস্টেমটি ৫ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে সক্ষম ছিল। কাতার এই রাডারটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করার পর এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, ইরানের সস্তা কিন্তু কার্যকরী প্রযুক্তির সামনে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন দাবি করছে, এই গুরুত্বপূর্ণ রাডারগুলো ধ্বংস হওয়ার ফলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেছে।
সমুদ্রপথেও যুক্তরাষ্ট্রের সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক রণতরী ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড বর্তমানে অকেজো হয়ে গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই জাহাজটি কোনো শত্রু দেশের হামলায় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মোতায়েনের ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়া নাবিকদের সম্ভাব্য নাশকতার কারণে অগ্নিকাণ্ডের শিকার হয়েছে। গত ১২ মার্চ জাহাজের লন্ড্রি সেকশনে শুরু হওয়া সেই আগুন নেভাতে প্রায় ৩০ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। মার্কিন নৌবাহিনী এখন তদন্ত করে দেখছে, জাহাজটিকে বন্দরে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্লান্ত নাবিকরাই ইচ্ছে করে এই আগুন লাগিয়েছিল কি না।
টানা দশ মাস সমুদ্রে থাকায় নাবিকদের মনোবল ভেঙে পড়েছে এবং জাহাজটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ভেনেজুয়েলা অভিযানে অংশ নেওয়ার পর থেকে এই রণতরীটি আর বিশ্রামের সুযোগ পায়নি। একের পর এক অভিযানের মেয়াদ বাড়ানোয় একদিকে যেমন যন্ত্রপাতির ওপর চাপ বেড়েছে, তেমনি নাবিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, কেবল বাহ্যিক হামলা নয় অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ত্রুটিও মার্কিন সামরিক শক্তিকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির ওপর এক বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন কেবল গোলাবারুদ খরচেই পেন্টাগনের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি ডলার। ইতোমধ্যে ৩০০টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যার প্রতিটি খরচ সাড়ে তিন মিলিয়ন ডলার। ওয়াশিংটন পোস্টের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধ চালিয়ে যেতে এবং ফুরিয়ে যাওয়া অস্ত্র ভাণ্ডার পূর্ণ করতে হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে অতিরিক্ত ২০০ বিলিয়ন ডলারের জরুরি বরাদ্দ চেয়েছে। এই বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যর্থতা বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
