অবিশ্বাস্য গতিতে শুকাচ্ছে গঙ্গা; হুমকিতে কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা

আন্তর্জাতিক

নিত্য নিউজ ডেস্কঃ

গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত নিঃশেষমান ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলোর একটি। প্রতি বছর পানির স্তর নেমে যাচ্ছে ১৫-২০ মিলিমিটার। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আর্সেনিক ও ফ্লুরাইড দূষণ, যা স্বাস্থ্য ও কৃষি—দুই ক্ষেত্রেই বিপদ ডেকে আনছে।
দক্ষিণ এশিয়ার কোটি মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ গঙ্গা নদী নজিরবিহীন গতিতে শুকিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, নথিবদ্ধ ইতিহাসে এমন শুষ্কতা আগে কখনো দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তন, অস্থিতিশীল মৌসুমি বৃষ্টি, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও বাঁধ নির্মাণ—সব মিলিয়ে নদীটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, পানীয়জল, মৎস্যসম্পদ ও জীবিকায়—পুরো অঞ্চলের খাদ্যনিরাপত্তাই হুমকির মুখে।হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত গঙ্গা অববাহিকা এশিয়ার অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ সরাসরি এ নদীর ওপর নির্ভরশীল। ভারতের মোট মিঠাপানির এক-চতুর্থাংশই আসে গঙ্গা অববাহিকা থেকে। নদীটি শুধু ধর্মীয় আচার বা সংস্কৃতির কেন্দ্র নয়, দক্ষিণ এশিয়ার কৃষি ও অর্থনীতিরও প্রধান চালিকাশক্তি।নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা নদীর প্রবাহের গত ১ হাজার ৩০০ বছরের জলবায়ুগত ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। তাতে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক দশকগুলোয় গঙ্গা অববাহিকা এমন ভয়াবহ খরার মুখোমুখি হয়েছে যা স্বাভাবিক জলবায়ুর ওঠানামার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। একসময় যেখানে সারা বছর নৌযান চলত, এখন গ্রীষ্মে বহু জায়গায় নৌকা আটকে যায়। অনেক খাল শুকিয়ে গেছে, আশপাশের টিউবওয়েল থেকেও আর পর্যাপ্ত পানি ওঠে না।

https___archive-images.prod.global.a201836.reutersmedia.net_2017_04_07_LYNXMPED350I9

হিমালয়ের হিমবাহ গলছে, নদী হারাচ্ছে প্রাণ

গঙ্গার উৎপত্তিস্থল গঙ্গোত্রী হিমবাহ মাত্র দুই দশকে প্রায় এক কিলোমিটার পিছিয়ে গেছে। হিমালয়ের আরো বহু হিমবাহ একই পরিণতির মুখে। শুরুতে এতে হঠাৎ বন্যা দেখা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা গ্রীষ্মকালে নদীতে পানিপ্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে। বিজ্ঞানীরা হিমালয়কে বলেন ‘এশিয়ার জলস্তম্ভ’। সেই স্তম্ভ যখন গলছে, তখন নিচের কোটি মানুষের পানির উৎসও নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

মানুষের হাতেই ত্বরান্বিত ধ্বংস

অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন গঙ্গার সংকটকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা এখন বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত নিঃশেষমান ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলোর একটি। প্রতি বছর পানির স্তর নেমে যাচ্ছে ১৫-২০ মিলিমিটার। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আর্সেনিক ও ফ্লুরাইড দূষণ, যা স্বাস্থ্য ও কৃষি—দুই ক্ষেত্রেই বিপদ ডেকে আনছে।

মানব প্রকৌশলও এখানে বড় দায়ী। ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের মতো প্রকল্প শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশে প্রবাহ কমিয়ে দিচ্ছে, ফলে দক্ষিণাঞ্চলের জমি লবণাক্ত হচ্ছে, সুন্দরবনের পরিবেশ হুমকিতে পড়ছে। স্বল্পমেয়াদী অর্থনৈতিক লাভের আশায় হুমকিতে নদীর দীর্ঘমেয়াদি জীবনীশক্তি।

সমাধান একটাই — যৌথ ও টেকসই পদক্ষেপ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খণ্ডিত উদ্যোগে কোনো ফল হবে না। দরকার সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা। প্রথমেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমিয়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। নদীতে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করা, আর জলবায়ু মডেলে মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব যুক্ত করা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করা। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালকে যৌথভাবে তথ্য বিনিময়, বাঁধ ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আন্তর্জাতিক তহবিল ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিও প্রয়োজন—কারণ গঙ্গা শুধু একটি নদী নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার জীবনরেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *