দ্রুত নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে

Uncategorized

জুলাই বিপ্লবের প্রথম বর্ষপূর্তিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে বলে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছেন। তাঁর এই ঘোষণার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারও রংপুরে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য রাজনৈতিক দলগুলো এবং দেশের জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।নির্বাচন ঘোষণার পর সারা দেশে যেমন একদিকে স্বস্তি এবং আনন্দের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে উৎকণ্ঠা ও শঙ্কা। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণার পর এখনো অনেকের মধ্যে সন্দেহ যে, শেষ পর্যন্ত কি নির্বাচন হবে? নাকি অন্য কোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি, সহিংসতা বা অরাজকতা নির্বাচনের পথকে বানচাল করে দেবে? নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পরও নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাটেনি। এই সংশয় না কাটার কারণ মোটা দাগে পাঁচটি।প্রথমত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি : দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে।বিভিন্ন স্থানে মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণের পরপরই গাজীপুরে সন্ত্রাসীদের হাতে সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন মারা গেছেন। যেভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, তা শুধু নজিরবিহীন নয়, পৈশাচিকও। এ ধরনের পৈশাচিক ঘটনা জনমনে ব্যাপকভাবে শঙ্কা সৃষ্টি করে।দেশের বিভিন্ন স্থানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি জনগণকে নতুন করে উদ্বিগ্ন করেছে। যদি নির্বাচনের আগে আগামী ছয় মাসে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি না হয়, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ উৎসবমুখর নির্বাচন কি আদৌ করা সম্ভব? কারণ যদি মব সন্ত্রাস বাড়তে থাকে, অপরাধীরা যদি অবাধে অপরাধ কর্ম করতে থাকে, তাহলে একদিকে যেমন ভোটারদের নিরাপত্তা থাকবে না, মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, তেমনি নির্বাচনে পেশিশক্তির প্রভাব, অবৈধ অস্ত্রের প্রয়োগ দেখা যাবে। এটি নির্বাচনের পুরো পরিবেশকে নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।এক বছর হয়ে গেল পুলিশ বাহিনী এখনো যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এখনো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।সশস্ত্র বাহিনী মাঠে দায়িত্ব পালন করার জন্যই হয়তো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ঠিকঠাক আছে। না হলে পুরোপুরি ‘জোর যার মুল্লুক তার’ রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হতো। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর এই নজরদারি এবং হস্তক্ষেপ কত দিন চলবে? নির্বাচনের আগে অবশ্যই পুলিশ বাহিনীকে সক্রিয় করতে হবে। প্রয়োজনে সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করে পুলিশ বাহিনীকে সংগঠিত করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। পুলিশ বাহিনী যদি সক্রিয় না হয়, তাহলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। আর এ কারণেই এখনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুলিশ বাহিনীকে সক্রিয় করা, কর্মক্ষম করা এবং তারা যেন নির্ভয়ে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা।দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা : প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের ঘোষণার পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। হলে ছাত্ররাজনীতি করা যাবে না, এই দাবিতে শিক্ষার্থীরা গত শুক্রবার মধ্যরাতে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে উপাচার্য দাবি মেনে নেন। সামনে ডাকসু নির্বাচন। ডাকসু নির্বাচনের আগে ঢাবি ক্যাম্পাসে এ ধরনের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আমরা জানি যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো আন্দোলনের সূতিকাগার। যেকোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলে সেটি সারা দেশে পল্লবিত হতে বেশি সময় লাগে না। কাজেই অন্তর্বর্তী সরকারকে ঢাকা বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ডাকসু নির্বাচন করাটা কতটা যৌক্তিক এবং সে ধরনের প্রস্তুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আছে কি না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নানা দল, নানা মত ক্যাম্পাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা করছে। ফলে প্রতিনিয়তই ক্যাম্পাসে নানা রকম উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। গত ৫ আগস্ট ছাত্রশিবিরের সঙ্গে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর বিরোধ আমরা দেখেছি। আবার ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণা নিয়ে যেভাবে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করা হয়েছে, তাতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনো উত্তপ্ত। ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে সামনে এই উত্তাপ আরো বাড়বে। এখানে একটি গোষ্ঠী নির্বাচন বানচালের জন্য যদি সক্রিয় চেষ্টা করে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোর পরিস্থিতিও স্বাভাবিক নয়। ক্যাম্পাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কখনো পুলিশ বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, যাবেও না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দরকার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিবিড় পরিচর্যা, তৎপরতা। ডাকসুর নির্বাচনকে ঘিরে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শুধু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি তামাশা দেখতে চায়, তাহলে সেটি হবে বড় ভুল। ডাকসু নির্বাচনে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে তার মাসুল দিতে হবে গোটা দেশকে। তার প্রভাব অনিবার্যভাবে জাতীয় নির্বাচনের ওপর পড়বে। কাজেই ডাকসু নির্বাচন এবং অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে। এখানে জয়-পরাজয়ের চেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সবচেয়ে বড় বিষয় বলে মনে করেন অনেকে।তৃতীয়ত, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার : প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর আমরা দেখছি যে, ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। এই অস্ত্রগুলো যে গত বছর ৫ আগস্টের পরে বিভিন্ন থানা থেকে লুণ্ঠিত সেটা বুঝতে কারো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এসব অবৈধ অস্ত্র এখনো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন স্থানে। অনেকের ধারণা, এই অবৈধ অস্ত্রগুলো আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির একটি বড় কারণ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এই অবৈধ অস্ত্রগুলো ব্যবহার হতে পারে। আর এ কারণেই সরকারের অনতিবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য অভিযান পরিচালনা করা উচিত। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না হলে আগামী নির্বাচনের শঙ্কা-উৎকণ্ঠা কাটবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, কেবল একটা নির্বাচন অনুষ্ঠানই একমাত্র কথা নয়। নির্বাচন যেন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়, সেটি নিশ্চিত করাটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি করার জন্য অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের কোনো বিকল্প নেই। দেশে নতুন করে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য বেড়েছে। তারা তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই কিশোর গ্যাং এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কঠোর নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। কোন বিবেচনায় কিভাবে তারা জেল থেকে ছাড়া পেল, সেটি অবশ্যই দেখতে হবে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে যদি দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যায়, তাহলে আগামী নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতার আশঙ্কা কেউ উড়িয়ে দিতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *