বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্টরা কোনো পেশার মানুষকে গুলির নিশানা থেকে রেহাই দেয়নি। দেড় হাজারের বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। শত শত সন্তান, ভাই-বোন চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেছেন।অনেকে চোখ হারিয়ে আজীবনের জন্য অন্ধ হয়ে গেছেন। তবু পলাতক ওই ফ্যাসিস্ট চক্রের মনে এখনো কোনো অনুতাপ-অনুশোচনা নেই।’তিনি বলেন, ১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ। আর ২০২৪ সালে ছিল স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ।গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের লন্ডন থেকে জাতির উদ্দেশে ভার্চুয়ালি দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান এসব কথা বলেন।বক্তব্যের শুরুতে তারেক রহমান বলেন, ‘আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে ২০২৪ সালের এই দিনে (৫ আগস্ট) ফ্যাসিস্ট বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়েছে। রাহুমুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতা, গণতন্ত্রপ্রিয় জনগণের জন্য দিনটি আনন্দের।দিনটি বিজয়ের। রাহুমুক্ত বাংলাদেশের এই দিনটিকে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশের জনগণ প্রতিবছর এই দিনটিকে স্বাধীনভাবে সানন্দে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে উপভোগ করবে। স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার চর্চার নতুন অঙ্গীকারে উদ্বুদ্ধ হবে। একুশ শতকের এই বাংলাদেশে পলাতক স্বৈরাচার এক বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করেছিল।গুম, খুন, অপহরণ, হামলা-মামলা, নির্যাতন-নিপীড়নকে সাধারণ ও স্বাভাবিক ঘটনায় রূপান্তর করেছিল। এই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা আন্দোলনের সময় বিএনপিসহ ভিন্ন দল ও মতের গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির লাখো কোটি নেতাকর্মীর জন্য দেশকে নরকে পরিণত করে রাখা হয়েছিল। শত শত মিথ্যা মামলার কারণে ভিন্ন দল ও মতের লাখ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থককে ঘরবাড়িছাড়া করে দেওয়া হয়েছিল। অনেকের পারিবারিক বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেছে। যাঁরা কৌশলে ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনা করতে চান, তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চাই, ৫ আগস্ট বাংলাদেশে যা ঘটেছে, এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও মনে হয় নজিরবিহীন। এই দিন গণভবন ছেড়ে ফ্যাসিস্ট পালিয়েছে। সংসদ ভবন রেখে সাংসদ পালিয়েছে। আদালত ছেড়ে প্রধান বিচারপতি পালিয়েছে। বায়তুল মোকাররম ছেড়ে প্রধান খতিব পালিয়েছে। ক্যাবিনেট ছেড়ে মন্ত্রীরা পালিয়েছে। ফ্যাসিস্টের দোসররা গা ঢাকা দিয়েছে।’বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ দেশের সব সাংবিধানিক বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছিল। সংবিধান উপেক্ষা করে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল। দেশকে চিরতরে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিনষ্ট করার সব আনুষ্ঠানিকতা প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। বই-খাতা-কলমের পরিবর্তে রাজনীতির নামে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল লগি-বৈঠা-হাতুড়ি-চাপাতি। বিপর্যস্ত করে দেওয়া হয়েছিল দেশের অর্থনীতি। ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে ফেলা হয়েছিল। দেশ থেকে লাখ কোটি টাকা পাচার করে দেওয়া হয়েছে। অন্যায়, অনিয়ম, অনাচার, দুরাচার, লুটপাট দৈনন্দিন চিত্র হয়ে উঠেছিল। দেশে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল ব্যক্তিতন্ত্র।গণ-অভ্যুত্থানে সব পেশার মানুষের অবদান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, রিকশাওয়ালা, মুটে মজুর, গার্মেন্টসকর্মী, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, গৃহবধূ, নারী ও শিশু এমনকি আমাদের মায়েরা—সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমে এসেছিল। গণ-অভ্যুত্থান দমন করতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল। কোলের শিশু, শহীদ আবু সাঈদ, ওয়াসিম, মুগ্ধ—আমাদের এসব সাহসী সন্তানের বুকে গুলি করে শহীদ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে ফ্যাসিস্টের শেষ রক্ষা হয়নি।’গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও বাংলাদেশ ভুলবে না মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৭১ সাল ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ। আর ২০২৪ সালে ছিল স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ। ১৯৭১ সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশ ভোলেনি। ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও বাংলাদেশ ভুলবে না। ১৯৭১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা অর্জন, স্বাধীনতা রক্ষা, স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এভাবে ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে লাখো মানুষ শহীদ হয়েছেন। আজকের এই দিনে আমি আবারও সব শহীদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আহতদের দ্রুত আরোগ্য লাভের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছি।’ইনসাফভিত্তিক গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের মাধ্যমেই শহীদদের ঋণ পরিশোধ করতে পারার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে শহীদরা আমাদের ঋণী করে গেছেন। এবার শহীদদের প্রতি আমাদের ঋণ পরিশোধের পালা। শহীদদের পরিবারের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। দেশে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে সাম্য মানবিক মর্যাদা সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটা করতে পারি।’দেশে কখনোই ফ্যাসিবাদ কায়েম হতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “হাজারো শহীদের রক্তস্নাত রাজপথে ফ্যাসিবাদবিরোধী অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশে আর কখনোই ফ্যাসিবাদ কায়েম হবে না, কাউকে গণতন্ত্র হত্যা করার সুযোগ দেওয়া হবে না, বাংলাদেশকে আর কখনোই তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে দেওয়া হবে না। আমি মনে করি, এসব প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য বহাল আছে, থাকবে। ‘মায়ের চোখে বাংলাদেশ’ যেমন, আমরা তেমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেখানে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী, সংশয়বাদী প্রতিটি সন্তান, প্রতিটি মানুষ নিরাপদে থাকবে। আজ ও আগামী দিনের প্রতিটি ‘৫ আগস্ট’ হয়ে উঠুক গণতন্ত্র সুশাসন প্রতিষ্ঠা আর মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার অঙ্গীকারের দিন। এই সুমহান অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দীর্ঘ যাত্রায় আমি এবং আমার দল বিএনপি দেশের সব গণতন্ত্রকামী জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা আশা করছি।”
